যশোর আইটি পার্ক

যশোর আইটি পার্ক (Jessore IT Park)

শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, যশোর—যা সাধারণভাবে যশোর আইটি পার্ক নামে পরিচিত—বাংলাদেশ সরকারের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী উদ্যোগ। দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) খাতকে ঢাকাকেন্দ্রিক অবস্থা থেকে বের করে এনে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই এই পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য এটি একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে যশোর আইটি পার্ক শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির প্রতীক।

ঐতিহাসিক পটভূমি

বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করার সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই যশোর আইটি পার্কের যাত্রা শুরু। প্রযুক্তির উন্নয়ন যেন শুধু রাজধানী ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ না থাকে—এই লক্ষ্য নিয়ে সরকার ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৩০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে যশোরে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু করে।

দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার পর ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এই পার্ক উদ্বোধন করেন। এই উদ্বোধন শুধু একটি ভবনের নয়, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ডিজিটাল ভবিষ্যতের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আধুনিক অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা

যশোর আইটি পার্ক আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো ও আধুনিক সুবিধাসমূহ নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে দেশি ও বিদেশি আইটি কোম্পানিগুলো সহজেই এখানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

মাল্টি-টেন্যান্ট বিল্ডিং (MTB)

১৫ তলা বিশিষ্ট এই ভবনটির মোট আয়তন প্রায় ২,৩২,০০০ বর্গফুট। এখানে একাধিক আইটি ও সফটওয়্যার কোম্পানি একসাথে কাজ করার সুযোগ পায়।

ডরমিটরি ভবন

১২ তলা বিশিষ্ট এই আবাসিক ভবনটি তিন-তারকা মানের, যেখানে আইটি পেশাজীবী, প্রশিক্ষণার্থী ও শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন।

কনভেনশন সেন্টার

সেমিনার, কর্মশালা ও প্রযুক্তি সম্মেলনের জন্য রয়েছে আধুনিক কনভেনশন সেন্টার, যা জ্ঞান আদান-প্রদান ও নেটওয়ার্কিংকে আরও কার্যকর করে।

বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধা

পার্কটির নিজস্ব ৩৩ কেভিএ পাওয়ার সাব-স্টেশন রয়েছে। পাশাপাশি উচ্চগতির ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আইটি শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যান্য সুবিধা

আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং, আধুনিক জিমনেসিয়াম, ক্যাফেটেরিয়া ও অ্যাম্ফিথিয়েটার—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও পেশাদার কর্মপরিবেশ।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি

যশোর আইটি পার্ক ইতোমধ্যেই দেশি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। উদ্বোধনের সময় এখানে ৪০টির বেশি কোম্পানিকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার মধ্যে জাপানের দুটি আইটি কোম্পানিও রয়েছে।

এই পার্ক থেকে ভবিষ্যতে প্রায় ৫,০০০ জনের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে যশোরসহ আশপাশের জেলাগুলোর তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বিনামূল্যে কাজ করার সুযোগ তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করছে।

পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

যশোর আইটি পার্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। নির্মাণ ও পরিচালনা—উভয় পর্যায়ে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া পার্কের ভবনগুলো ভূমিকম্প-সহনশীল, যা কর্মরত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

কৌশলগত গুরুত্ব

যশোর আইটি পার্ক খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে ঢাকাকেন্দ্রিক আইটি কার্যক্রমের চাপ কমানো সম্ভব হচ্ছে এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি সরকারের আইসিটি রপ্তানি বৃদ্ধি ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিশ্বমানের সুবিধা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও স্টার্টআপ সহায়ক নীতির কারণে যশোর আইটি পার্ক ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আইসিটি খাতকে আরও শক্তিশালী করবে। গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা করবে।

শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, যশোর—ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে একটি বাস্তব উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রযুক্তি খাত দেশব্যাপী উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে পারে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
যশোর আইটি পার্ক কবে উদ্বোধন করা হয়?
১০ ডিসেম্বর ২০১৭।
যশোর আইটি পার্কের প্রধান সুবিধাগুলো কী কী?
১৫ তলা মাল্টি-টেন্যান্ট বিল্ডিং, ১২ তলা ডরমিটরি, কনভেনশন সেন্টার, হাই-স্পিড ইন্টারনেট, আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং, জিম ও ক্যাফেটেরিয়া।
যশোর আইটি পার্কে কতটি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে?
৪০টির বেশি কোম্পানি।
যশোর আইটি পার্ক থেকে কতজনের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে?
প্রায় ৫,০০০ জনের সরাসরি কর্মসংস্থান।
যশোর আইটি পার্কের কৌশলগত গুরুত্ব কী?
আইটি খাতকে বিকেন্দ্রীকরণ, ঢাকার প্রভাব কমানো এবং খুলনা বিভাগের ১০টি জেলায় প্রযুক্তিগত ভারসাম্য তৈরি করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top