বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লোকজ প্রযুক্তির ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হলো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যাটারিমুক্ত, ডিজেলচালিত যানবাহন। বিশেষ করে যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো, তা শুধু কোনো নির্দিষ্ট সাধারণ পরিবহন মাধ্যম ছিল না; বরং তা ছিল গ্রামীণ জীবনযাত্রার মূল চালিকাশক্তি, স্থানীয় কৃষকদের একমাত্র ভরসা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার এক চলন্ত দলিল। আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহনে নোসিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটি এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়েছিল। সরকারি কোনো প্রথাগত প্রকৌশল বিদ্যা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্থানীয় মেকানিক ও কামারদের মেধা দিয়ে তৈরি এই গাড়িগুলো যেভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছিল, তার গল্প আজ রূপকথার মতো শোনায়।
- মূল ইঞ্জিন: সেচ কাজে ব্যবহৃত ডিজেল চালিত স্যালু মেশিন (Shallow Engine)।
- উৎপত্তি অঞ্চল: যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর জেলা।
- প্রধান ব্যবহার: কৃষিপণ্য পরিবহন, স্থানীয় হাটে মালামাল আদান-প্রদান ও স্বল্প ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন।
- পরিবর্তনের কারণ: আইনি নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তার অভাব এবং আধুনিক বৈদ্যুতিক ইজিবাইক ও পিকআপ ভ্যানের আগমন।
উদ্ভাবনের লোকজ ইতিহাস: নোসিমন ও করিমনের উৎপত্তি
কৃষিপ্রধান যশোরে কৃষিপণ্য দ্রুত এবং সাশ্রয়ী মূল্যে স্থানীয় বাজারগুলোতে পৌঁছানো একসময় অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। গরু-মহিষের গাড়ি কিংবা ম্যানুয়াল ভ্যান দিয়ে বিশাল পরিমাণ ধান, পাট, শাকসবজি ও ফলমূল পরিবহন করা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল ছিল। ঠিক এই সংকটের মধ্য থেকেই জন্ম নেয় লোকজ উদ্ভাবনী প্রযুক্তি। খেতের সেচ কাজে ব্যবহৃত চীন থেকে আমদানিকৃত ডিজেলচালিত স্যালু ইঞ্জিনকে স্টিল বা কাঠের ফ্রেমের সাথে যুক্ত করে চাকা বসিয়ে রূপ দেওয়া হয় নোসিমন ও করিমনের।
স্থানীয় লোকগাথা ও মেকানিকদের মতে, এই নামগুলোর পেছনেও রয়েছে আকর্ষণীয় গল্প। সেসময় নতুন কোনো উদ্ভাবনকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য ও আপন করে তোলার জন্য গ্রামীণ মানুষের পরিচিত নারী নাম—’নসিমন’ বা ‘করিমন’ রাখা হয়েছিল। যশোর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার স্থানীয় গ্যারেজগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট ব্লু-প্রিন্ট ছাড়াই কেবল হাতুড়ি, ঝালাই মেশিন ও মেকানিকদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে এসব গাড়ি তৈরি হতে থাকে। বিস্তারিত ইতিহাস জানতে আপনি নসিমন সংক্রান্ত উইকিপিডিয়া নিবন্ধ দেখতে পারেন।
যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো: গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর অবদান
যশোরের অর্থনীতি মূলত কৃষি এবং সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্রিক। যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো, তা যদি না থাকতো তবে তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি হয়তো অনেকটাই পিছিয়ে থাকতো। নিচে এই বাহনগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কৃষিপণ্য পরিবহনে দ্রুততা ও সাশ্রয়
যশোরের শার্শা, চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও মনিরামপুরের বিস্তীর্ণ মাঠ থেকে উৎপাদিত সবজি ও ধান খুব দ্রুত শহরের বড় বাজারগুলোতে এবং বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য নোসিমন-করিমন ছিল অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বেনাপোল স্থলবন্দর সংলগ্ন অঞ্চলে স্থানীয় বাণিজ্যিক মালামাল স্বল্প খরচে আনা-নেওয়ায় এসব গাড়ি অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল।
২. কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আত্মকর্মসংস্থান
একটি নোসিমন বা করিমন তৈরি ও পরিচালনার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন হাজার হাজার মানুষ। গাড়ি চালক, হেলপার, গ্যারেজ মেকানিক, খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রেতা এবং পাম্প মেরামতকারীদের জন্য বিশাল এক কর্মসংস্থানের বাজার তৈরি হয়েছিল। অনেক বেকার যুবক স্যালু ইঞ্জিন কিনে স্থানীয় গ্যারেজ থেকে গাড়ি বানিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছিলেন।
যান্ত্রিক গঠন ও বৈচিত্র্য: নোসিমন, করিমন, ভটভটি ও আলমসাধুর পার্থক্য
বাহ্যিকভাবে অনেকে এই সব বাহনকে একই মনে করলেও যান্ত্রিক গঠন এবং ব্যবহারের দিক থেকে এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল। নিচে এদের মূল পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:
- নোসিমন: মূলত কিছুটা বড় আকারের এবং পেছনে কাঠের বিস্তৃত বডি বিশিষ্ট বাহন, যা প্রধানত ভারি মালামাল এবং কৃষিপণ্য বহনে ব্যবহৃত হতো।
- করিমন: কিছুটা ছোট ও চটপটে ধাঁচের বাহন। এটি যাত্রীবাহী হিসেবে এবং হালকা পণ্য পরিবহনে বেশি দেখা যেতো।
- ভটভটি: ইঞ্জিন চালু হলে বিকট ‘ভট-ভট’ শব্দ হতো বলে এর নামকরণ করা হয় ভটভটি। এটি সাধারণত এক অক্ষের (Single Axle) স্টিয়ারিং মেকানিজমে পরিচালিত হতো।
- আলমসাধু: মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের উদ্ভাবন হলেও যশোরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এটি তুলনামূলক বেশি মজবুত স্টিলের ফ্রেমে তৈরি হতো।
আইনি জটিলতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও মহাসড়কে নিষেধাজ্ঞা
নোসিমন-করিমনের উপযোগিতা যতই থাকুক না কেন, সময়ের সাথে সাথে এর কিছু মারাত্মক বিপজ্জনক দিক উন্মোচিত হতে থাকে। যান্ত্রিক ত্রুটি এবং অনভিজ্ঞ চালকদের কারণে যশোরের মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
১. নিরাপত্তার মারাত্মক অভাব
এই গাড়িগুলোতে কোনো আধুনিক ব্রেকিং সিস্টেম, হাইড্রোলিক ব্রেক বা প্রথাগত স্টিয়ারিং গিয়ার বক্স ছিল না। গতি বেশি থাকলে জরুরি মুহূর্তে গাড়ি থামা নো প্রায় অসম্ভব ছিল। তাছাড়া ইঞ্জিনের বিকট শব্দ ও প্রচণ্ড কম্পন চালকের শারীরিক নানা সমস্যা ও মনোযোগ ভঙ্গের কারণ হতো।
২. সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও বিআরটিএ-র অবস্থান
যেহেতু এই গাড়িগুলোর কোনো নির্দিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং ছিল না এবং এরা সড়ক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হতো, তাই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) এদের অনুমোদন দেয়নি। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে নোসিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটি চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও এর ফলে সৃষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। বিশেষ করে যশোর প্রেস ক্লাব ভিত্তিক স্থানীয় সাংবাদিকগণ সেসময়ের পরিবহন সংকট এবং বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে নানামুখী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন।
যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো: নস্টালজিয়া ও আধুনিকতার রূপান্তর
মহাসড়কে নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপের কারণে সময়ের আবর্তে যশোরের প্রধান সড়কগুলো থেকে নোসিমন-করিমন হারিয়ে গেছে। তবে এটি প্রযুক্তিগত বিবর্তনের পথ খুলে দিয়েছে। বর্তমানে সেগুলোর জায়গা দখল করে নিয়েছে:
- ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও অটো ভ্যান: যা পরিবেশবান্ধব (শব্দহীন) এবং নিয়ন্ত্রণে সহজ।
- ছোট থ্রি-হুইলার ও বাণিজ্যিক পিকআপ: টাটা বা মাহিন্দ্রার মতো বাণিজ্যিক থ্রি-হুইলার গাড়িগুলো এখন নিরাপদে কৃষিপণ্য বহন করছে।
- পাওয়ার ট্রিলার চালিত ট্রলি: যা বর্তমানে কেবল গ্রামীণ কাঁচা রাস্তায় সীমিত পরিসরে দেখা যায়।
আজ যশোর শহরের দড়াটানা মোড়, মুড়লী মোড় কিংবা পালবাড়ী মোড়ে তাকালে আর সেই স্যালু ইঞ্জিনের বিকট শব্দ শোনা যায় না। কিন্তু প্রবীণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের মনে আজও যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো, তার স্মৃতি সজীব হয়ে আছে। তা ছিল বাঙালি জাতির চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকিয়া থাকার এবং নিজস্ব সম্পদে সমাধান খুঁজে বের করার এক অনন্য উদাহরণ।
উপসংহার: গ্রামীণ লোকজ প্রযুক্তির অমর স্মৃতি
যশোরের পরিবহন ইতিহাসের পাতায় নোসিমন-করিমন কেবল একজোড়া ধাতব বাহনের নাম নয়; এটি ছিল এক যুগের প্রতীক। লোকজ মেধা, প্রয়োজন এবং বেঁচে থাকার তাগিদে তৈরি এই অননুমোদিত বাহনটি তৎকালীন সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থার ঘাটতিকে একা হাতে সামাল দিয়েছিল। আধুনিক নিরাপত্তার খাতিরে হয়তো আজ এগুলো রাজপথ থেকে নির্বাসিত, কিন্তু বাংলাদেশের লোকজ প্রযুক্তি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক বিবর্তনের আলোচনায় যশোরের নোসিমন-করিমন চিরকাল এক স্বর্ণালী অধ্যায় হয়ে থাকবে।