যশোরের নোসিমন-করিমন

যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো: সেই চলন্ত ইতিহাসের গল্প

নব্বইয়ের দশক বা একুশ শতকের শুরুর দিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র যশোরের রাজপথ ও মেঠোপথে যারা হেঁটেছেন, তাদের কানে নিশ্চিতভাবেই একটি পরিচিত শব্দ বাজবে—’ফট-ফট-ফট-ফট’। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে পিচঢালা পথ ধরে ছুটে চলা সেই অদ্ভুত যানগুলোর কথা মনে পড়লে আজও যেন নস্টালজিক হয়ে পড়েন এই অঞ্চলের মানুষ। যশোরের নোসিমন-করিমন নামে পরিচিত এই যানবাহনগুলো শুধুই কোনো যান্ত্রিক গাড়ি ছিল না, বরং তা ছিল স্থানীয় কারিগরদের অদম্য প্রকৌশল উদ্ভাবন এবং গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। একটি সময় ছিল যখন যশোরের গ্রামীণ অর্থনীতি, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এই থ্রি-হুইলার ও ফোর-হুইলার যন্ত্রদানবগুলো।

প্রথাগত গাড়ি তৈরির কারখানায় নয়, বরং সাধারণ লেথ মেসিন আর ওয়ার্কশপের হাতুড়ির পেটাইয়ে জন্ম নেওয়া এই যানগুলো যশোরের পরিবহন চিত্রে বহু বছর রাজত্ব করেছে। তবে সময়ের আবর্তে, গতি বৃদ্ধি ও সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে হাইকোর্টের কড়া আইনি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে এই যানগুলো আজ রাজপথ থেকে প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু যশোরের লোকজ স্মৃতি এবং চলন্ত ইতিহাসে এদের ভূমিকা আজও অমলিন। এই প্রবন্ধে আমরা ফিরে দেখব যশোরের রাস্তায় একসময় রাজত্ব করা নোসিমন-করিমন ও আলমসাধুর উত্থান, গ্রামীণ সমাজে এদের প্রভাব, মেকানিকদের কারিগরি দক্ষতা এবং এদের বিদায়ের নেপথ্য ইতিহাস।

যশোরের নোসিমন-করিমন: দেশীয় প্রকৌশল নাকি অনিরাপদ উদ্ভাবন?

যশোর ও আশেপাশের এলাকায় নোসিমন-করিমন বা আলমসাধু নামক যানগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল মূলত চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদ থেকে। আশির দশকের শেষভাগে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশের কৃষিখাতে একটি বড় পরিবর্তন আসে। সেচ কাজের জন্য ব্যাপক হারে আমদানি শুরু হয় সেচ পাম্পের জন্য শ্যালো ইঞ্জিন (Shallow Engine)। কিন্তু বর্ষাকালে বা সেচ মৌসুমের বাইরে এই চিনা ইঞ্জিনগুলো বেকার পড়ে থাকতো।

যশোরের স্থানীয় দক্ষ গ্যারেজ কারিগররা চিন্তা করলেন, কীভাবে এই শ্যালো ইঞ্জিনকে সচল রেখে বছরের ১২ মাস কাজে লাগানো যায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক অভিনব ভাবনা। কাঠের বা লোহার মজবুত চ্যাসিস বানিয়ে তার ওপর সেচ কাজের ডিজেল শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে বেল্ট ও পুলির মাধ্যমে চাকার সাথে সংযোগ ঘটানো হয়। এভাবেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া কেবল অভিজ্ঞতা ও মেধার জোরে জন্ম নেয় যশোরের নোসিমন-করিমন

নোসিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটির পার্থক্য

বাইরের মানুষের কাছে এগুলোকে একই ধরণের যান মনে হলেও, স্থানীয় লোকজনের কাছে এবং চালকদের পরিভাষায় এদের মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু গঠনগত ও ব্যবহারিক পার্থক্য ছিল:

  • নোসিমন: মূলত তিন চাকা বিশিষ্ট বা চার চাকার মাঝারি আকৃতির যান। এটি সাধারণত যাত্রী এবং হালকা মালপত্র বহনে ব্যবহৃত হতো। সামনের অংশটি দেখতে কিছুটা ত্রিভুজাকৃতির ছিল।
  • করিমন: নোসিমনের চেয়ে কিছুটা বড় ও শক্তপোক্ত আকারের চার চাকার যান। ভারী কৃষিপণ্য, ইট, বালু ও কাঠ পরিবহনের জন্য করিমনের ব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশি।
  • আলমসাধু: চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ সীমান্ত ঘেঁষে উদ্ভাবিত এবং যশোরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত তিন চাকার একটি বিশেষ কাঠামো, যার স্টিয়ারিং হ্যান্ডেল ছিল বেশ লম্বা।
  • ভটভটি: এটি মূলত ইঞ্জিনের শব্দের নামানুসারে দেওয়া ডাকনাম। যেকোনো শ্যালো ইঞ্জিনচালিত চলন্ত যানকেই গ্রামবাংলায় এক বাক্যে ভটভটি বলা হতো।

যশোরের নোসিমন-করিমন যেভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা বদলে দিয়েছিল

যশোর জেলা সব সময়ই কৃষি উৎপাদনে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অঞ্চল। সবজি, ধান, গম, পাট এবং ফুল চাষে যশোর বিখ্যাত। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে কাঁচা মেঠোপথ থেকে মূল হাইওয়েতে দ্রুত ও কম খরচে কৃষিপণ্য নিয়ে যাওয়া ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথাগত গরুর গাড়ি বা ঠেলা গাড়িতে সময় লাগতো প্রচুর, আর বড় ট্রাকের ভাড়া ছিল ক্ষুদ্র কৃষকদের সামর্থ্যের বাইরে।

এমন এক সংকটাপন্ন সময়ে যশোরের নোসিমন-করিমন কৃষকদের কাছে দেবদূতের মতো হাজির হয়। এটি সরাসরি কৃষকের খেতের পাশ থেকে শাকসবজি ও ধান লোড করে চলে যেতে পারতো শহরের আড়তে কিংবা বেনাপোল স্থলবন্দর সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায়। কম তেল খরচ ও স্বল্প ভাড়ার কারণে স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পেতে শুরু করেন।

১. কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

যশোরের মনিহার, উপশহর, ঝিকরগাছা, শার্শা, মনিরামপুর ও কেশবপুরের হাজার হাজার বেকার যুবক নোসিমন-করিমন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করে। শুধুমাত্র চালক হিসেবেই নয়, এই যানগুলোকে কেন্দ্র করে স্পেয়ার পার্টসের দোকান, স্থানীয় লেথ ওয়ার্কশপ, মেকানিক এবং বডি মেকিং গ্যারেজে এক বিশাল কর্মসংস্থানের বাজার গড়ে ওঠে।

২. সুলভ যাত্রী পরিবহন

যেসব গ্রামীণ রুটে বাস বা মিনিবাস চলতো না, সেখানে সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে নোসিমন। ১০-১২ জন যাত্রী অনায়াসে একটি নোসিমনে বসে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বা শহরের বাজারে আসা-যাওয়া করতে পারতেন। স্বল্প ভাড়ায় দ্রুত পৌঁছানোর সুবিধা থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে এটি দ্রুতই জনপ্রিয়তা লাভ করে।

কারিগরি গঠন: কীভাবে তৈরি হতো এই লোকজ বাহন?

একটি মানসম্মত গাড়ি তৈরি করতে যেখানে বিলিয়ন ডলারের গবেষণা ও রোবোটিক অ্যাসেম্বলি লাইনের প্রয়োজন হয়, সেখানে যশোরের মেকানিকরা সম্পূর্ণ হাতে কলমে কোনো ব্লু-প্রিন্ট ছাড়াই এগুলো তৈরি করতেন। এটি ছিল রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ও লোকজ মেধার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

উপাদান ব্যবহারের উৎস / বৈশিষ্ট্য
ইঞ্জিন চিন থেকে আমদানিকৃত ১২ থেকে ১৬ হর্সপাওয়ারের ডিজেল শ্যালো পাম্প ইঞ্জিন।
চ্যাসিস পুরোনো ট্রাক বা বাসের স্টিল অ্যাঙ্গেল পাত্তি কেটে ওয়েল্ডিং করে তৈরি।
গিয়ারবক্স পুরোনো রিকন্ডিশনড মোটরসাইকেল বা জিপ গাড়ির গিয়ারবক্স সংযোজন।
বডি স্থানীয় শাল, কড়ই কাঠ অথবা লোহার শিট দিয়ে তৈরি বডি।
ব্রেক সিস্টেম প্রাথমিক দিকে মেকানিক্যাল রড ব্রেক, পরবর্তীতে তেল ব্রেক বা ড্রাম ব্রেক।

এই কারিগরি উদ্ভাবন বিশ্বমানের না হলেও, স্থানীয় ভৌগোলিক বাস্তবতা ও কাদা-জল ভরা কাঁচা রাস্তার উপযোগী হিসেবে এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকরী। ভারী বোঝা নিয়ে যেকোনো কাদা রাস্তা অনায়াসে পার হওয়ার ক্ষমতা ছিল এর।

দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা শঙ্কা: কেন আইনি নিষেধাজ্ঞায় পড়ে নোসিমন-করিমন?

যদিও যশোরের নোসিমন-করিমন গ্রামীণ অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব গতি এনেছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটি রাজপথের আতঙ্কে পরিণত হয়। বিজ্ঞানসম্মত ডিজাইন না থাকা এবং সড়ক নিরাপত্তার ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ না করায় দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিবহন নীতিমালার তোয়াক্কা না করে হাইওয়েতে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করায় মৃত্যুর মিছিল বাড়তে থাকে।

নিরাপত্তাজনিত মূল ত্রুটিসমূহ:

  1. হাইড্রোলিক ব্রেক বা সেন্টার অফ গ্র্যাভিটির অভাব: জরুরি মুহূর্তে ব্রেক কষলে ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে যাওয়া ছিল এর নিত্যদিনের ঘটনা।
  2. অতিরিক্ত ভাইব্রেশন বা কম্পন: ইঞ্জিনের প্রবল ঝাঁকুনিতে চালক দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়তেন এবং নিয়ন্ত্রণ হারাতেন।
  3. নিয়ন্ত্রণহীন স্টিয়ারিং: অধিকাংশ যানবাহনে কোনো প্রফেশনাল স্টিয়ারিং বক্স ছিল না, যা মোড় ঘুরতে গিয়ে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতো।
  4. অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক: ড্রাভিং লাইসেন্স বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই যে কেউ এই যান চালাতে পারতো।

যশোর-খুলনা, যশোর-ঝিনাইদহ এবং যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে একের পর এক মারাত্মক দুর্ঘটনার পর আদালত ও সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। ২০১৪ সালের আগস্টে মহামান্য হাইকোর্ট যশোরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০টি জেলার মহাসড়কে নোসিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটি চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বিআরটিএ (BRTA) ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন রাজপথে অভিযান চালিয়ে এই অনিবন্ধিত যানগুলো বাজেয়াপ্ত করা শুরু করে।

যশোরের রাস্তায় নোসিমন-করিমনের বিকল্প প্রযুক্তির আগমন

হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারির ফলে যশোরের রাজপথ থেকে ধীরে ধীরে নোসিমন-করিমন তুলে নিতে বাধ্য হন মালিকরা। তবে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা তো থমকে থাকতে পারে না! ফলে নোসিমনের শূন্যস্থান পূরণ করতে বাজারে আগমন ঘটে নতুন প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব যান।

বর্তমানে আপনি যদি যশোরের দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরতে বের হন, তবে রাজপথে আর বিকট শব্দের শ্যালো ইঞ্জিনের গাড়ি দেখবেন না। এর জায়গা দখল করে নিয়েছে—

  • ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা: যা শব্দহীন, ধোঁয়া মুক্ত এবং শহরের অভ্যন্তরে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম।
  • মাহিন্দ্রা ও সিএনজি অটোরিকশা: যা কিছুটা নিরাপদ এবং এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করে।
  • স্মল কমার্শিয়াল পিকআপ (Tata Ace, Mahindra Bolero): যা গ্রামীণ কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে নোসিমনের পারফেক্ট ও আইনি বিকল্প হয়ে উঠেছে।

নস্টালজিয়া ও লোকজ ইতিহাসের পাতায় যশোরের নোসিমন-করিমন

প্রযুক্তি ও আইনের অগ্রগতিতে আজকের দিনে নোসিমন-করিমন হয়তো রাজপথ থেকে নির্বাসিত, কিন্তু যশোর অঞ্চলের আধুনিকায়নের ইতিহাসে এর অবদান অনস্বীকার্য। এটি প্রমাণ করেছিল যে বাংলার মানুষের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও, নিজেদের সমস্যা সমাধানের জন্য তারা কতটা সৃজনশীল হতে পারে।

“নোসিমন-করিমন কেবল একটি ইঞ্জিন চালিত গাড়ি ছিল না; এটি ছিল সংকটকালে যশোরের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার এক মেধাভিত্তিক লোকজ আবিষ্কার। নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে তা বাতিল হয়েছে সত্য, কিন্তু এর মধ্য দিয়েই আজকের আধুনিক গ্রামীণ পরিবহনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।”

আজও যশোরের প্রবীণ মেকানিক বা প্রবীণ কৃষকরা যখন চা-এর দোকানে বসেন, তখন তাদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই কাঁচা রাস্তায় কাদা ঠেলে নোসিমন চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর গল্প। এটি আজ আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এক ‘চলন্ত ইতিহাস’ (Living History)।

উপসংহার

পরিশেষে, যশোরের নোসিমন-করিমন আমাদের পরিবহন ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় কীভাবে গ্রামীণ মানুষ চরম প্রতিকূলতার মাঝেও নিজস্ব প্রযুক্তিতে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নেয়। সময়ের প্রয়োজনে নিরাপত্তা ও আধুনিকতার স্বার্থে এই যানগুলো ইতিহাস হয়ে গেছে, কিন্তু যশোর অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের গল্পে নোসিমন-করিমনের ইঞ্জিনের সেই ‘ফট-ফট’ শব্দ চিরকাল এক নতুন সূচনার প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Nova

Digital Companion
Scroll to Top