যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো: সেই চলন্ত ইতিহাসের গল্প

যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো: সেই চলন্ত ইতিহাসের গল্প

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং দেশের প্রথম স্বাধীন জেলা হিসেবে যশোরের রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। তবে এই অঞ্চলের লোকজ জীবনের সঙ্গে যা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, তা হলো যোগাযোগের স্থানীয় মাধ্যম। ৮০ ও ৯০-এর দশকে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো: সেই চলন্ত ইতিহাসের গল্প আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি ও উদ্ভাবনী মানসিকতার এক অনন্য দলিল। এটি কেবল কোনো যান্ত্রিক যানবাহনের গল্প নয়, বরং এটি ছিল গ্রামীণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহন এবং লোকায়ত প্রকৌশলের এক জীবন্ত উদাহরণ।

কৃষিপ্রধান যশোর অঞ্চলের কৃষক যখন তাদের উৎপাদিত সবজি, ধান, কিংবা পাট নিয়ে শহরের বাজারে পৌঁছাতে পারতেন না, ঠিক তখনই স্থানীয় মেকানিকদের হাত ধরে জন্ম নেয় এই যান। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া কেবল মেধা ও প্রয়োজনকে মূলধন করে শ্যালো ইঞ্জিনের সাহায্যে তৈরি হওয়া এই যানটি পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল।

নোসিমন, করিমন ও আলমসাধু: কী ছিল এই অদ্ভুত যানগুলো?

‘নোসিমন’, ‘করিমন’, ‘ভটভটি’ কিংবা ‘আলমসাধু’—নামগুলো ভিন্ন হলেও এদের মূল প্রযুক্তিগত ভিত্তি ছিল প্রায় একই। সেচ কাজে ব্যবহৃত ডিজেল চালিত শ্যালো ইঞ্জিনকে (Shallow Engine) গাড়ির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। চ্যাসিস তৈরি করা হতো স্থানীয় কাঠ ও লোহার ফ্রেম দিয়ে। চালকের বসার জায়গা ছিল একদম উন্মুক্ত, আর পেছনের অংশে থাকতো পণ্য বা যাত্রী বহনের জন্য কাঠের তৈরি বড় বডি।

যশোরের মেকানিকরা অতি সাধারণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এই যানবাহনগুলো তৈরি করতেন। কোনো প্রথাগত অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা ছাড়া তৈরি হলেও এগুলো ১০ থেকে ২০ কুইন্টাল পর্যন্ত ওজন অনায়াসে বহন করতে পারতো। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় উইকিপিডিয়ার নোসিমন সংক্রান্ত নিবন্ধে

নোসিমন ও করিমনের প্রযুক্তিগত গঠন

  • ইঞ্জিন: চীনের তৈরি ৮ থেকে ১৬ অশ্বক্ষমতার (Horsepower) একক চিলিন্ডারের সেচ ইঞ্জিন।
  • জ্বালানি: সাশ্রয়ী ডিজেল, যা প্রতি লিটারে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারতো।
  • চ্যাসিস ও বডি: দেশীয় শাল বা কড়ই কাঠ এবং লোহার পাতের সমন্বয়ে তৈরি মজবুত কাঠামো।
  • স্টিয়ারিং: পুরোনো ট্রাক্টর বা পরিত্যক্ত গাড়ির স্টিয়ারিং মেকানিজম কেটে বসানো।
  • ব্রেক ব্যবস্থা: প্রথমে কাঠের তৈরি প্যাডেলভিত্তিক ঘর্ষণ ব্রেক, যা পরবর্তীতে সামান্য উন্নত করা হয়েছিল।

যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো: সেই চলন্ত ইতিহাসের গল্প ও অর্থনৈতিক প্রভাব

যশোরের কৃষি অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই লোকজ বাহনটির অবদান ছিল অপরিসীম। চৌগাছা, ঝিকরগাছা, বাগহারপাড়া কিংবা অভয়নগর থেকে প্রতিদিন টন কে টন তাজা সবজি বাজারে নিয়ে আসার জন্য নোসিমন-করিমন ছিল কৃষকের এক নম্বর ভরসা। বাস বা ট্রাকের ভাড়া যেখানে সাধারণ ক্ষুদ্র কৃষকদের সাধ্যের বাইরে ছিল, সেখানে অত্যন্ত স্বল্প ভাড়ায় এই যানগুলো ক্ষেতের আইল থেকে সোজা আড়তে পণ্য পৌঁছে দিত।

যশোরের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারেও এর ভূমিকা কম ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান যেমন আফিল গ্রুপ যশোর এর মত বড় বড় খামার ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও কাঁচামাল পরিবহনে নোসিমন-করিমনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন।

গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভুমিকা

  1. চালক ও হেলপার: হাজার হাজার বেকার গ্রামীণ যুবক খুব অল্প পুঁজিতে নোসিমন বা করিমন কিনে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পান।
  2. স্থানীয় ওয়ার্কশপ: যশোর শহর ও উপজেলা শহরগুলোতে শত শত মেকানিক ও গ্যারেজ গড়ে ওঠে, যেখানে এই যান তৈরি ও মেরামতের কাজ চলতো।
  3. ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী: পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনে প্রত্যন্ত গ্রামের হাটে হাটে গিয়ে বিক্রি করার সুযোগ তৈরি হয়।

যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো: সেই চলন্ত ইতিহাসের গল্প এবং নিরাপত্তার বিতর্ক

নোসিমন-করিমন অর্থনৈতিকভাবে যতটাই লাভজনক ছিল, সড়ক নিরাপত্তার দিক থেকে এটি ছিল ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। মূলত এই কারণেই পরবর্তীতে এটিকে ‘মৃত্যুদূত’ বলেও অভিহিত করা হতে থাকে। পেশাদার অটোমোবাইল ডিজাইনের অভাব এবং অপরিকল্পিত ব্রেক ব্যবস্থার কারণে প্রায় প্রতিদিনই যশোর-খুলনা কিংবা যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতো।

এই যানগুলোর প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

নোসিমন-করিমনের প্রধান প্রযুক্তিগত ত্রুটি:

১. দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেম: দ্রুত গতিতে চলন্ত অবস্থায় জরুরি থামানো প্রায় অসম্ভব ছিল।
২. ভারসাম্যহীনতা: অতিরিক্ত পণ্য বোঝালে বাঁক নেওয়ার সময় উল্টে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকতো।
৩. হেডলাইটের অভাব: রাতের বেলা অধিকাংশ গাড়িতেই ভালো আলো থাকতো না, ফলে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা বেশি ঘটতো।
৪. চালকের লাইসেন্সহীনতা: কোনো ধরনের প্রথাগত ড্রাইভ শিক্ষা বা বিআরটিএ লাইসেন্স ছাড়াই অপ্রাপ্তবয়স্করাও এটি চালাতো।

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) এবং উচ্চ আদালত ২০১৪ সাল থেকে দেশের মহাসড়কগুলোতে নোসিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটি চলাচল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

আইনি নিষেধাজ্ঞা ও বিকল্প যানবাহনের আবির্ভাব

উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর যশোর জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কগুলোতে নোসিমন-করিমন উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে। হাজার হাজার নোসিমন চালক ও মালিক তাদের জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। কিন্তু সময়ের আবর্তে ও প্রযুক্তির প্রসারে এই শূন্যস্থান পূরণ করে নতুন নতুন পরিবেশবান্ধব ও তুলনামূলক নিরাপদ যান।

বর্তমানে যশোরের শহরাঞ্চল ও শহরতলিতে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, থ্রি-হুইলার ও অটোভ্যানের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। যারা একসময় শহরের বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যেতেন, যেমন যশোর পৌর পার্ক কিংবা বড় বাজারে, তারা এখন নোসিমন বা করিমনের বদলে স্বাচ্ছন্দ্যে ইজিবাইকে চলাচল করেন।

নস্টালজিয়া ও লোকজ উদ্ভাবনের প্রতীক

আজ হয়তো যশোরের পিচঢালা রাজপথে সেদিনের সেই বিখ্যাত ‘ভট-ভট-ভট-ভট’ শব্দ আর শোনা যায় না। কিন্তু যশোরের মানুষের স্মৃতিতে আজও তা উজ্জ্বল। এটি ছিল চরম প্রতিকূলতার মাঝে বাঙালি জাতির ‘জুগাড়’ (Jugaad) বা লোকজ প্রযুক্তির উদ্ভাবনী শক্তির এক জলন্ত প্রমাণ। বিজ্ঞান বা আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ছাড়া কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে সাধারণ মানুষের এই সৃষ্টিশীলতা ইতিহাসের পাতায় এক বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে।

সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ (Summary)

বিষয় বিবরণ
ইঞ্জিনের ধরন একক সিলিন্ডার শ্যালো সেচ ইঞ্জিন (ডিজেল)
প্রধান অঞ্চল যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর
প্রধান ভূমিকা কৃষি পণ্য পরিবহন ও স্বল্প খরচে গ্রামীণ যাতায়াত
বন্ধ হওয়ার কারণ নিরাপত্তার অভাব, উচ্চ দুর্ঘটনার হার ও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা
বর্তমান বিকল্প ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, মাহিন্দ্রা ও মোটরচালিত ভ্যান

উপসংহার

প্রযুক্তির বিবর্তন এবং সময়ের চাহিদায় পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে গ্রহণ করতেই হয়। নোসিমন-করিমন হয়তো আজ যশোরের মহাসড়ক থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিকে একসময় সচল রাখতে এর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। যশোরের রাস্তায় একসময় যে নোসিমন-করিমন চলতো: সেই চলন্ত ইতিহাসের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার এবং পথ খুঁজে নেওয়ার আমাদের অদম্য বাঙালি মানসিকতাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Nova

Digital Companion
Scroll to Top