বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত যশোর শহরের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি কিংবদন্তি নাম — যশোর মনিহার সিনেমা হল। শুধু একটি সিনেমা হল নয়, এটি কয়েক দশকের স্মৃতি, ভালোবাসা ও সিনেমাপ্রেমীদের আবেগের ঠিকানা। ১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান আজও আধুনিক রূপে টিকে আছে, যা বাংলাদেশের সিনেমা ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ।
🕰️ অতীতের ঝলক: মনিহারের জন্ম
মনিহার সিনেমা হলের যাত্রা শুরু হয়েছিল এক সাহসী স্বপ্ন নিয়ে। প্রখ্যাত স্থপতি কাজী মোহাম্মদ হানিফ এই বিশাল থিয়েটারটির নকশা তৈরি করেন। উদ্বোধনের সময় এতে ছিল ১,৪৩০টি আসন, যা তখনকার বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ সিঙ্গেল-স্ক্রিন সিনেমা হল ছিল।
সেই সময় মনিহারের আধুনিক স্থাপত্য, বিশাল হলরুম, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ এবং উন্নত শব্দব্যবস্থা একে অন্যসব হল থেকে আলাদা করে তুলেছিল। এমনকি জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড থেকেও মানুষ এই ব্যতিক্রমী থিয়েটার দেখতে এসেছেন—ভাবুন তো, যশোরে তখন কী লেভেলের হাইপ ছিল! 😎
এছাড়াও পড়ুন: যশোর জেলার বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব
মনিহারে প্রথম প্রদর্শিত চলচ্চিত্র ছিল দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘জনি’, যেখানে অভিনয় করেছিলেন কিংবদন্তি সোহেল রানা ও বাবিতা। এরপর থেকে এটি ঢালিউডের বড় বড় সিনেমার প্রিমিয়ারের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
⚠️ সংকটের সময়
সব ভালো জিনিসের মতো মনিহারকেও খারাপ সময় দেখতে হয়েছে। ২০১২ সালে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা ও চাঁদাবাজির কারণে মনিহার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তখন অনেকেই ভেবেছিল, “এই বুঝি শেষ!”
কিন্তু না—মনিহার হার মানেনি। যশোরের মানুষ, সিনেমাপ্রেমী ও কর্তৃপক্ষ একসাথে দাঁড়িয়ে আবার মনিহারকে ফিরিয়ে আনে। এটি ছিল শুধু একটি হল নয়, এটি ছিল যশোরের গর্ব।
🎥 আধুনিক যুগে পদার্পণ: মনিহার সিনেপ্লেক্স
সময়ের সঙ্গে সিনেমাপ্রেমীদের চাহিদাও পরিবর্তিত হয়েছে। তাই ২০২৪ সালে যশোর মনিহারকে সম্পূর্ণভাবে রিনোভেট করে আধুনিক রূপে “মনিহার সিনেপ্লেক্স” আকারে পুনঃউদ্বোধন করা হয়। এটি শুধুমাত্র নাম পরিবর্তন নয়—পুরো সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতাই এখন লেভেল আপ।
নতুন সিনেপ্লেক্সে রয়েছে এক ৬৬ আসনের আধুনিক মিনি থিয়েটার, যেখানে দর্শকরা উপভোগ করতে পারবেন:
❄️ সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আরামদায়ক পরিবেশ
🔊 ডলবি সারাউন্ড সাউন্ডের মাধ্যমে উন্নত শব্দের অভিজ্ঞতা
💡 আধুনিক লাইটিং ও ভিজ্যুয়াল সিস্টেম
🪑 আরামদায়ক, প্রিমিয়াম সিটিং ব্যবস্থা
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে এটি উদ্বোধন হয়, এবং উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হয় ‘দরদ’। এই আপগ্রেডের মাধ্যমে মনিহার যশোর ও পুরো খুলনা বিভাগের প্রথম মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।
ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে আধুনিক প্রযুক্তি ও সুবিধার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই মনিহারের বড় শক্তি। এখন এখানে সিনেমা দেখা শুধু বিনোদন নয়—এটি হয়ে উঠেছে এক অভিজ্ঞতা, যা ইতিহাস ও আধুনিকতার মিলনস্থল। 💪🎬
এছাড়াও পড়ুন: যশোর কিসের জন্য বিখ্যাত?
🏛️ শুধু সিনেমা নয়, একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
মনিহার কমপ্লেক্সটি প্রায় চার বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে। এখানে শুধু সিনেমা হল নয়, রয়েছে—
- 🏢 কমিউনিটি সেন্টার
- 🛏️ রেস্ট হাউস
- 🛍️ প্রায় ৪০টি দোকান
ভেতরের বড় বড় সিঁড়ি, ঝাড়বাতি ও নান্দনিক স্থাপত্য মনিহারকে একধরনের রাজকীয় অনুভূতি দেয়। এটা যেন শুধু সিনেমা দেখার জায়গা নয়—একটা ফুল এন্টারটেইনমেন্ট জোন।
📍 যোগাযোগ ও ঠিকানা
ঠিকানা:
- মনিহার, যশোর–নড়াইল রোড, যশোর ৭৪০০, বাংলাদেশ
মোবাইল:
- 📞 01748-184898
📞 01711-267575
ওয়েবসাইট:
যখন দেশের অনেক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন মনিহার আজও দাপটের সাথে টিকে আছে। কারণ এটি কেবল ব্যবসা নয়—এটি ইতিহাস, আবেগ ও সংস্কৃতির অংশ।
১৯৮৩ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের আধুনিক সিনেপ্লেক্সে রূপান্তর—মনিহার প্রমাণ করেছে যে, সময়ের সাথে বদলালে ঐতিহ্য টিকে থাকে। আজও যশোরের মানুষ, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকেও দর্শকরা মনিহারে আসে শুধু সিনেমা দেখতে নয়—একটি জীবন্ত ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
1. যশোর মনিহার সিনেমা হল কবে চালু হয়?
৮ ডিসেম্বর, ১৯৮৩ সালে।
2. যশোর মনিহার সিনেমা হল কে ডিজাইন করেছেন?
স্থপতি কাজী মোহাম্মদ হানিফ।
3. প্রথম কোন সিনেমা এখানে দেখানো হয়েছিল?
‘জনি’ (সোহেল রানা ও বাবিতা অভিনীত)।
4. মনিহার কখন বন্ধ হয়েছিল?
২০১২ সালে নিরাপত্তাজনিত কারণে।
5. মনিহার আবার কবে চালু হয়?
পুনরায় আধুনিকায়নের পর ২০২৪ সালে।
6. নতুন নাম কী?
মনিহার সিনেপ্লেক্স।
7. নতুন মিনি থিয়েটারে কত আসন আছে?
৬৬টি আসন।
8. এখানে কী ধরনের সাউন্ড সিস্টেম আছে?
ডলবি সারাউন্ড সাউন্ড।
9. যশোর মনিহার সিনেমা হল কোথায় অবস্থিত?
যশোর–নড়াইল রোড, যশোর।
10. এটি কি যশোরের প্রথম মাল্টিপ্লেক্স?
হ্যাঁ, পুরো খুলনা বিভাগে প্রথম।



